বাংলাদেশ রেলওয়ে অতীত বর্তমান

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান:
আধুনিক বিশে^ প্রায় সকল দেশেই রেলওয়ে সল্প সময়ে সল্প ব্যয়ে অধিক নিরাপদ যানবাহন ও পরিবহণ মাধ্যম হিসেবে অত্যাধিক গুরুত্বের দাবি রাখে। অন্যান্য যানবানের অপেক্ষা রেলপথে যাতায়াতের জ¦ালানী খরচ অপেক্ষকৃত কম। আমেরিকা, ইউরোপ সহ উন্নত দেশগুলোতে এখনো রেলের কদর আগের চেয়ে কম নয়। প্রতিবেশী ভারতেও রেলওয়েকে প্রধানতম যোগাযোগ, যাতায়াত ও পরিবহণ সেক্টর হিসেবে পরিগণিত করা হয়। পাতালরেল, রোপট্রেন, শাটলট্রেন দস্তুর মতো চলাচল করে।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব রেলওয়ে পরবর্তিতে ভারত, পাকিস্তান এবং সব শেষে বাংলাদেশে সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কালের বিবর্তনে দীর্ঘ দিনের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে বাংলাদেশের রেলওয়ের সেক্টরটির অবস্থা খুবই করুন। বর্তমানে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে রেলওয়ের পুরনো ঐতিহ্য ফিরে আসতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ইঞ্জিন ও বগি উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। উন্নত বিশে^র প্রতি কিলোমিটার রেলওয়ের স্থাপনায় যে পরিমান ব্যয় হয় তার চেয়ে প্রায় তিন গুণ ব্যয়ে দেশের রেলওয়ের সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে। এ নিয়ে সম্প্রতি দেশের প্রধান প্রধান দৈনিক গুলোতে ফলাও করে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা- জগতি রেলওয়ের স্টেশনের ৫৭.২৫ কি.মি. তদানিন্তন ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ে (রেলপথ) ট্রেন চলাচলের যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা নারায়নগঞ্জ ১৪.৯৮ কি.মি. রেলপথ বাণিজ্যিক ভাবে চালু হয়। ১৮২৫ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর সর্বপ্রথম যাত্রীবাহী রেলগাড়ি চলাচল শুরু করে। রেলগাড়ির জনক জর্জ স্টিফেন সন্সের বিখ্যাত ইঞ্জিনটির নাম ছিল লোকোমোশন।

আন্তদেশীয় ট্রেন মৈত্রী এক্্রপ্রেস ও বন্দর এক্সপ্রেস বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেন সংখ্যা ০৪টি। সম্প্রতি ভারতের সাথে রেলযোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি সীমান্তের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ করার উদ্যোগে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় এ প্রকল্পটি অনুমদিত হয়েছে বলে রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এখন থেকে জুন-২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অংশের কাজ সমাপ্ত হবে বলে আশা করা যায়। অপরদিকে ভারত অংশের রেলপথ নির্মাণ কাজ গত ২০১৭ সালেই শেষ হয়েছে।

বাংলাদেশের রেল স্টেশন সংখ্যা ৪৬০টি, যাত্রীবাহী ট্রেন সংখ্যা ৩৫০টি, তন্মধ্যে আন্তনগর ট্রেন ৮৮টি,মেইল এক্সপ্রেস এবং কমিউটার ট্রেন ১৩২টি ও লোকাল ট্রেন ১২৬টি। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৮৪৭.৩৭ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যমান, তন্মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ১৫৩৯.১০ কিলোমিটার এবং পূর্বাঞ্চলে ১৩০৮.২৭ কিলোমিটার চালু রয়েছে। পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী আন্তনগর ট্রেনের সংখ্যা ২৪টি।

সূত্র মতে জানা যায়-১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার নীলফামারী-ডোমারে চিলাহাটিতে চিলাহাটি আন্তর্জাতিক চেকপোষ্ট স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে সে চেকপোষ্টটি স্থলবন্দরে উন্নীত করা হলে পুরোদমে স্থলবন্দরের কার্যক্রম চালু হয়। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এ বন্দরটি চালু থাকলেও রেলচলাল বন্ধ হয়ে যায়। শুধু চেকপোষ্ট চালু রাখা হয়। পরবর্তীতে ভারত সরকার তাদের অংশের রেলপথ তুলে নিয়ে রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

অপরদিকে দীর্ঘ দিন পরিত্যাক্ত নীলফামারীর সীমান্তবর্তী রেলস্টেশন চিলাহাটি ও ভারতের কোচবিহার জেলার পুরাতন রেলস্টেশন আবার চালু হতে যাচ্ছে। এই পথে রেল চালু হলে ঢাকা থেকে সরাসরি পর্যটকদের স্বর্গ বলে খ্যাত দার্জিলিং পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হলে দু’দেশের যাত্রী সাধারণের বিপুল সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা যায়।

ভারতের শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রথম রেললাইন চালু হয় ১৮৬২ সালে। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন কুষ্টিয়ার জগতি। সেই ঐতিহ্যবাহী নানা স্মৃতিময় রেলস্টেশনটি আজ মৃত প্রায়। সংস্কার না থাকায় এ স্টেশনের পুরাতন ভবনগুলো ধ্বষে পড়েছে। রেলস্টেশন ও এর আশে পাশের জমি-জমা গাছ-পালা প্রভাবশালীদের কর্তৃক বেহাত হয়ে গেছে। এ স্টেশনটি এক সময় যাত্রী সাধারণের যাতায়াতের রমরমা কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। বিপুল সংখ্যক লোক সমাগমের কারণেই জগতি বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। মালামাল-আমদানি-রপ্তানির জন্য সহজ পরিবহণ হিসেবে জগতি বাণিজ্যিভাবে প্রশিদ্ধতা লাভ করে। প্রায় ২০০ বছর আগের সেই স্টেশনের স্মৃতি বহণকরে দুপাশে দুটি বড় আকারের ইন্দারা। পাশে রয়েছে গভীর দীঘি যা কালে স্বাক্ষী হিসেবে এখনো বিদ্যমান। এক কালে যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তায় ২৬ জন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী দিনরাত কর্মব্যস্থ থাকতো, এ প্রতিবেদন লেখা সময় স্টেশনে জনবল নিয়োজিত আছে মাত্র তিনজন।

১৮৯৭ সালে দর্শনা পোড়াদহ সেকশনটি সিঙ্গেল লাইন থেকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা হয়। পর্যায়ক্রমে ১৯০৯ সালে পোড়াদহ ভেড়ামারা, ১৯১৫ সালে ভেড়ামার ইশ^রদী এবং ১৯৩২ সালে ইশ^রদী আব্দুলপুর সেকশনগুলোকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে ডাবল লাইনের কাজ অনেকাংশে স্থাপিত হয়েছে। বর্তমান ঢাকা-যমুনা সেতু ও ঢাকা-জামালপুর রেলওয়ে ট্রেন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ রুটে ডাবল লাইন স্থাপন করা সময়ের দাবী।

বাংলাদেশ রেলওয়ে বাহাদুরাবাদ ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের রেলসেকশনটিতে যমুনা নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় প্রায় দেড় যুগ আগে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়, এতে এ রুটে রেলের ঐতিহ্য প্রায় শূণের কোঠায় পৌছে যায়। পরে যমুনা সেতু নির্মাণের পর সড়ক পথ ও রেলপথে দেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রী সাধারণের চলাচলের জন্য সুযোগ সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত হয়। বর্তমানে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এই সেতুটি নির্মাণ কাজ সপন্ন হলে দেশের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চলাচলের ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার মাত্রা আরোও বৃদ্ধি পাবে। ভারতের কোলকাতার সাথে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দরটিতে প্রাণচঞ্চল্য ফিরে আসবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকারের আমলে অর্থাৎ ১৮৭০ সালে অসম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নীলফামারীর সৈয়দপুরে বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করা হয়। এই পথ দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে হলদি বাড়ি চিলাহাটি সৈয়দপুর এবং দর্শনা দিয়ে কোলকাতা পর্যন্ত রেলযোগাযোগ অব্যহত ছিলো। বহুযুগ পরে হলেও ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যে সরাসরি রেলযোগে যাতায়াতের ফলে দু’দেশের আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিপুল সংখ্যক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সেই সাথে নিরাপদে সাচ্ছন্দে রেলযোগে যাতায়াতের নানাবিদ সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

১৯৮২-৮৩ সালে রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দু’টি জোনে ভাগ করা হয়। রেলওয়ে পশ্চিম ও পূর্ব জোন। দেশে বর্তমানে মিটারগেজ (৩ ফুট ৩.৩৮ ইঞ্চি) ব্রডগেজ (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি) রেলপথ চালু আছে। ১৯১৪ সালে শাকোলে থেকে শান্তাহার পর্যন্ত মিটারগেজ সেকশনটিকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয় এবং ১৯২৪ সালে শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত প্রায় ৯৬ কিলোমিটার, ১৯২৬ সালে পার্বতীপুর থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৩৭ কি.মি., ১৯১৬ সালে ভেড়ামারা-রায়টা পর্যন্ত মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজ সেকশন চালু করা হয়। ১৯২৮-২৯ সালে তিস্তা হতে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ন্যারাগেজ সেকশনটিকে আবার মিটারগেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৩০ সালে আব্দুলপুর আমনুরা ব্রডগেজ সেকশনটি চালু হয়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের পশ্চিমাংশের জামালপুর টাউন জংশণ হয়ে বাহাদুরাবাদ ও জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের রেলসেকশনটিতে ১৯৪১ সালে মিটারগেজ স্থাপন করা হয়।

ইতোমধ্যে কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া সেকশনের সাথে কাশিয়ানী-গোপালগঞ্জ, টুঙ্গিপাড়া ও দোহাজারি হতে রামু হয়ে কক্সবাজা হয়ে গুনদুম পর্যন্ত এবং খুলনা হতে মংলা পোর্ট, যমুনা সেতু পূর্ব হতে জামালপুরের সরিষাবাড়ি পর্যন্ত নতুন রেলপথ স্থাপন করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়। বর্তমানে ডুয়েলগেজ, মেট্রোরেল চালুর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রেলস্টেশনে জরাজীর্ণ ভবনগুলো ভেঙ্গে একই মডেলে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে টিকেট বিক্রির প্রথাসহ ইন্টারনেটে ওয়েব সাইটের মাধ্যমে কম্পিউটার ও মোবাইলের মাধ্যমে যাত্রী নিবন্ধন প্রক্রিয়া সপন্ন করে যাতায়াতে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমানে জাপান সহ উন্নত দেশগুলোতে রেলের গতি প্রতি ঘন্টায় যখন ৩৬০-৪০০ কিলোমিটার, তখন বাংলাদেশের রেলের গতি প্রতি ঘন্টায় গড়ে ৪০-৬০ কিলোমিটার তবে আন্তনগর ট্রেনের গতি প্রতি ঘন্টায় গড়ে ৮০ কিলোমিটার। সেই সাথে রেলওয়েকে আধুনিকায়নের নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া সত্বেও রেলওয়ের বিগত ৪৭ বছরের ব্যবধানে তুলনামূলক ভাবে যাত্রী সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। যাত্রী সাধারণের মনে রেলওয়ের কদর থাকলেও বর্তমানে রেলপথে যাতায়াতের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর বহুবিদ কারণ রয়েছে তন্মধ্যে নি¤েœ বেশ কিছু কারণ উল্লেখ যোগ্য। যেমন-

ঘন ঘন রেল দূর্ঘটনা, প্রাণহানী, ট্রেনে অগ্নি সংযোগ, হরতাল. রেললাইনের স্লিপার তুলে ফেলা, সময় সূচীর বিপর্যয়,পয়ঃ প্রণালীর দূরাবস্থা, নিরাপদ পানি ও খাবারের অভাব, নিরাপত্তার অভাব, ভয়াবহ বন্যায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়া, ব্রিজ-কালভার্ট ফাঁটলধরা, ভাঙাচোড়া সিট, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকা, চুরি, ছিনতাই, চলন্ত ট্রেন থেকে যাত্রীকে ফেলে দেয়া, চলন্ত ট্রেনে ঢিল কাঁদা ছুঁড়ে মারা, রেলের যন্ত্রাংশ ও তেল চুরি, দূঘটনা জমিত যাত্রা বিরতি, সিগনালিং ব্যবস্থার ত্রুটি, দায়িত্বহীনতা, রেল ক্রসিংয়ে জনবলে অভাব, টিকেটের অপর্যাপ্ততা, কালো বাজারে টিকিট বিক্রি, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও বগির অভাব।

দক্ষ চালক ও পরিচালকে অভাব, রেলওয়ের জমাজমি, গাছা-পালা, পুরোনো ভবন বেদখল, রাতের বেলায় স্টেশন সহ আশেপাশের এলাকায় জুয়া, মদ ও তাসের আড্ডা, নেশা দ্রব্য সহ অবৈধ মালামাল পরিবহন, ট্রেনের অভ্যন্তরে হকারদের উপদ্রব, ধুমপান, বিনা টিকেটে যাত্রী যাতায়াত, আসনের চেয়ে বেশি টিকিট বিক্রি, গাদা-গাদি করে দাড়ানো যাত্রীদের দূর্ভোগ ও ঘামের গন্ধ রোগবালাই ছড়ায়, ভ্যপসা গরমে ফ্যানের অভাব, ছাড়পোকা, তেলাপোকার উপদ্রব, জানালা-দরজার নড়বড়ে অবস্থা, লোকসেড, লোকমটিভের অভাব, ইত্যাদি কারণে যাত্রীরা রেলের পরিবর্তে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অন্য যানবাহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে। যাত্রী সাধারণের অভাব সহ বাস্তবতার কারণে ইতোমধ্যে ২২৮ কিলোমিটার রেলপথ বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর দেশের মানুষ সংখ্যা তিন গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। যে কারণে যাতায়াতে অর্থ সাশ্রয় ও নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধার্থে তাদের মাঝে রেলপথকে বেছে নেয়ার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এছাড়া দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রি, খাদ্য শস্য সহজভাবে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে রেলওয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই রেলওয়ে সেক্টরকে আরও আধুনিক লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর যথপোযুক্ত কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ দেশের মানুষের নিরাপত্তার সাথে যাতায়াত ও পরিবহণের সুবিধা একটি রাষ্ট্রের জনগণের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার।

কম সময়ে, কম খরচে, যানযটবিহীন, নিরাপদে যাতায়াতের একটি ঝুঁকিহীন নির্ভরযোগ্য মাধ্যম রেলওয়ে। যে কারণে যাত্রীসাধারণ স্বাচ্ছন্দে রেলপথকেই বেঁছে নেয়ার প্রবণতা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। সড়ক পথে যাতায়াতের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি এড়াতে আজও রেলপথকেই বেঁছে নেয় যাত্রীরা। কিন্তু ইদানিং ঘন ঘন রেল দূর্ঘটনার কারণে রেলপথে যাতায়াতে নিরাপত্তা ও আতংকের বিষয়টি সম্প্রতি নতুন করে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরে জুন মাসে সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবণ এক্সপ্রেস কুলাউড়া স্টেশন সংলগ্ন বরচাল এলাকায় রাত ১১টায় ভয়াবহ রেল দূর্ঘটনায় ব্রিজ ভেগে ৫টি কোচ লাইনচ্যুত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৫ যাত্রী নিহত ও অধশতাধিক যাত্রী আহত হয়।

এর কিছুদিন পর ঢাকাগামী পারাবত, কাকনী ও চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস কুলাউড়া এলাকায় পৌছলে বেশকয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। গত ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার ভোর রাত পৌনে তিনটার দিকে সিলেট থেকে ছেড়েআসা উদয়ন ও চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তূর্ণানিশিতা এক্সেপ্রেস ট্রেনের মধ্যে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের নিকটে চান্দখোলা নামক স্থানে স্মরণকালের ভয়াবহ মূখোমূখি রেল সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত ও শত শত যাত্রী আহত হয়েছে। এই ঘটনার কান্না থামতে না থামতেই গত ১৪ নভেম্বর দুপুর দু’টা দশ মিনিটে দেশের দক্ষিণÑপশ্চিমাঞ্চলের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অন্তনগর এক্সেপ্রেস ট্রেনটির ১৪টি বগির মধ্যে ৯টি বগি লাইচ্যুত হয়ে ৬টিতে আগুন লেগে যায়।
এতে ট্রেনটির ইঞ্জিন, খাবারের গাড়ি ও এসিকেবিন পুঁড়ে যায় এবং অর্ধশতাধিক রেল যাত্রী আহত হয়।

এই প্রতিবেদনটি লেখার দুদিন আগে সর্বশেষ রেল দূর্ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ নভেম্বর ২০১৯। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী চট্টলা ৬৭-৭ আপ ট্রেনটি টংগিতে পৌছলে ব্যাটারী সেকশন থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। এতে ইঞ্জিনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে যাত্রীরা আতংক জনিত কারণে ১২জন যাত্রী আহত হয়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের রেলওয়ে গেটম্যান ছাড়াই চলছে ৭১৪টি রেলক্রসিং। এসব রেলক্রসিংয়ের অনুমোদন থাকলেও গেটম্যান নেই অধিকাংশ ক্রসিং পয়েন্টে। এছাড়া অনুমোদনবিহিন রেলক্রসিং রয়েছে ৩৩৯টি স্থানে। গত ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রেলক্রসিং পারের সময় ট্রেনের ধাক্কায় বরÑকণে যাত্রীবাহি মাইক্রোবাসে ১১জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এমন কোন মাস নেই দেশে কোন না কোন রেলক্রসিংয়ে ছোট অথবা বড় ধরনের রেল দূর্ঘটনা ঘটছে এবং প্রাণহানি হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ এর পর্যবেক্ষনে বলা হয়। ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরে ছোট বড় রেল দূর্ঘটনা হয় এক হাজার আটটি। ২০১০ সাল থেকে রেল দূর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করেছে ১১৫ জন রেলযাত্রী। তথ্যমতে জানা যায় ২০১০ সালে নরসিন্দিতে রেল দূর্ঘটনায় ১২ যাত্রীর মৃত্যুতে অনুসন্ধানে নামে বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল। তারা পর্যবক্ষেন করে রেলওয়ের বিষয়ে
বেশ কিছু শুপারিশ পেস করেন।

সড়ক রেল ও নৌপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি এর সাধারণ সম্পাদক আশীষদে বলেন-নজরদারীর অভাবেই ক্রটিপূর্ণ ভাবে চলছে রেল ব্যবস্থা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন-রেল ব্যবস্থাপনার ক্রটিগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রেলকর্তৃপক্ষ বলছে-রেলব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে দরকার সবমহলের সচেতনতা।

অভিজ্ঞ মহল মনে করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্থে কালো বিড়াল চিহ্নিত করে দূর্নীতিমুক্ত সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এই প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক এটিই দেশবাসী কাম্য। কারণ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের যোগ্যতা অর্জনে আধুনিক উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপদ যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা টেকসই এর গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি ও সামগ্রিক উন্নয়নের পরিধি কলেবরে আরও উন্নততর হোক এটি এখন সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জনদাবীতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সংলিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে না পারলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ শ্লোগানটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

লেখকঃ জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান
ই-মেইলঃ dr.mizanur470@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *