মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাঃ এস এম সি’র ভূমিকা

মোঃ লিয়াকত আলী সেখ::

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। শিক্ষার সাথে আমাদের সকল বিষয় সম্পর্কিত। আর প্রাথমিক শিক্ষা উচ্চতর শিক্ষার ভিত্তি কিন্তু টেকসই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ সহজ নয় । শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এ সংক্রান্ত তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) সকলে মিলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষার মানোন্নয়নে এস এম সি’র ভুমিকা অনস্বীকার্য। একটি বিদ্যালয়কে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে এসএমসি’র সদস্যগণ প্রধান শিক্ষককে দিক-নির্দেশনা, পরামর্শ দিতে পারেন।সেই পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষকগণ পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন।

ছাত্র-শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে এস এম সি গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিদ্যালয়ের সম্পত্তি রক্ষা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এস এম সির মৌলিক কাজ। সঠিক শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহ করার ক্ষেত্রে এস এম সি ভুমিকা থাকা জরুরী। এসএমসি একাধারে একাডেমিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখে।

তারা একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পর্যবেক্ষণ, One Day One Word কার্যকর করা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত এসেম্বলি হয় কিনা, শুদ্ধসুরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় কিনা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় কিনা, লিখন-পঠন দক্ষতা ইত্যাদি বিষয় তদারকি করতে পারে। এছাড়া বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রেও তদারকি করতে পারে।বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, দানশীল ব্যক্তিদেরকে উদ্বুদ্ধ করে অনুদান সংগ্রহপূর্বক বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে পারে।
আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং অভাব-অনটনের কারণে পরিবার থেকে শিশুদের শিক্ষায় নিরুৎসাহিত করে শিশুশ্রমে বাধ্য করা হয়। এক্ষেত্রে কোমলমতি শিশুরা যে বয়সে জ্ঞানের নতুন জগতে প্রবেশ করবে সেই সময়ে নিয়োজিত থাকতে হয় নতুন কাজে। এক্ষেত্রে এসএমসি’র সদস্যগণ অভিভাবকদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারে। এজন্য অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করা যেতে পারে। তাদেরকে শিক্ষার গুরুত্ব, বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের শিক্ষা সহায়তা সম্পর্কে অবহিত করে অভিভাবকদের মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অভিভাবক সমাবেশ থেকে প্রাপ্ত সুচিন্তিত মতামত, পরামর্শ এবং বাড়ীতে শিক্ষার্থীদের তত্বাব্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। অস্বচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানরা মেধার সামগ্রিক উৎকর্ষের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

বিত্তবানদের সহায়তায় এসএমসি এ সকল গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। সদস্যগণ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদেরকে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে হোম ভিজিট করে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন। পথশিশু ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনার এবং ধরে রাখার জন্য বিনা খরচে ভর্তির সুযোগ, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থাকরণ এবং দুপুরের খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এস এম সি।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা, যেমন টয়লেট ব্যবহারসহ চলাফেরা করা ও অন্যান্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে এস এম সি। শিশুদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলী বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা এস এম সি’র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনা জাগ্রতকরণে এস এম সি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারে। ছাত্রীরা বাল্যবিবাহ বা ইভটিজিংগের শিকার হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে খোজ-খবর নিতে পারেন। সরকারের সিদ্ধান্তানুযায়ী বিভিন্ন জাতীয় দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালনের পদক্ষেপ নিতে পারেন।

সরেজমিন পরিদর্শনে এস এম সি’র সদস্যদের কাজ পর্যবেক্ষণে তেমন দৃশ্যমান হিসেবে পাওয়া যায়না। অনেকেই আবার শিক্ষকদের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন। অনেক সদস্যেরই আবার তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই; এসএমসি’র দায়িত্বের বিষয়ে ধারণা নেই। তারা বিদ্যালয়ের সম্পত্তি রক্ষায় তেমন সচেষ্ট নয়। সদস্যদের এ জাতীয় কার্যকলাপ মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এজন্য এসএমসি গঠনে সতর্ক হতে হবে। প্রকৃত বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিদেরকেই যেন সদস্য করা হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আশার কথা হলো, সরকার অতি সম্প্রতি এসএমসি’র সভাপতি এবং অন্যান্য সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, এখন যে কেউ চাইলেই সভাপতি বা সদস্য হতে পারবেনা। সভাপতি হতে চাইলে তাকে কমপক্ষে স্নাতক পাশ হতে হবে। নবগঠিত এস এম সি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে বলে সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: মোঃ লিয়াকত আলী সেখ: উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেরপুর, বগুড়া :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *