সাতক্ষীরার প্লাবিত অঞ্চল জোয়ারে ডুবে, ভাটায় জাগে

এস,এম,হাবিবুল হাসান :
সাতক্ষীরার ‘জোয়ারে ডুবে, ভাটায় আবার জাগে, এই নিয়মে চলছে উপকূলীয় প্লাবিত অঞ্চলের দিন ক্ষণ। ভাঙ্গনের দু’মাস পেরিয়ে গেলেও বাঁধ আটকাতে পারিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। অথৈয় নদীর লবনাক্ত জলে জোয়ার ভাটা বয়ে চলেছে প্লাবিত অঞ্চলের ঘর দূয়ারে। বিষাক্ত হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা।

আজ থেকে ঠিক দুই মাস পূর্বে গত ২০ মে বুধবারে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে মহা প্রলয়ঙ্কারী জ্বলোচ্ছাস ঘুর্নিঝড় আম্ফান। সেই বিধ্বস্ত ঘুর্নিঝড়ের আঘাতে এ অঞ্চলে ঘরবাড়ি, গাছ গাছালি উপড়ে পড়ে ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়। ঘরবাড়ি, দোকান পাট, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ভেঙ্গে লন্ডভন্ড করে দেয় ঘুর্নিঝড় আম্ফান। অবশিষ্ট বেঁচে থাকা গাছগাছালি গুলো লবণাক্ত পানির জোয়ার ভাটার কারনে মরে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে এলাকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ। এ যেন দেখার কেউ নেই। লোকালয়ে মানুষের ঘর দুয়ার এ প্রবেশ করা জোয়ার ভাটা যেন প্রতিনিয়ত একটা নিয়ম তান্ত্রিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সেই ২০ মে-র আগ্রাসী কালো রাত্রে নদীর পানি কয়েক ফুট বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের পাউবোর চরম ঝুঁকিপূর্ণ জরাজীর্ণ বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে দেয় ঘুর্নিঝড় আম্ফান।

সাতক্ষীরা আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর অঞ্চলের পদ্মপুকুর বন্যাতলাসহ পাউবোর বেড়ীবাঁধের নয়টি পয়েন্ট দিয়ে ভেঙ্গে সম্পূর্ণ এলাকাটি প্লাবিত করে দেয় ঘুর্নিঝড় আম্ফান। সেই থেকে আজ অব্দি দুটি মাস পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য স্থানের জোয়ার-ভাটা আটকাতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সকল চেষ্টাই যেন ব্যর্থ করে দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। প্লাবিত হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার ভুক্তভোগী বানভাসি সর্ব শ্রেণী পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রিং বাঁধের মাধ্যমে জোয়ার ভাটার হাত থেকে বাঁচার জীবন মরণ চেষ্টা করে চলেছে স্থানীয়রা। বানভাসি প্লাবিত ভুক্তভোগীরা চুলা প্রতি, বিঘা প্রতি, অবস্থা শালির বেশি মাত্রায় টাকা উত্তোলন করে স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় রিং বাঁধের কাজ করে, তাতে সব অংশে সফলতা না হলেও কিছু অংশে সফলতা পেয়েছে। রিং বাঁধের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ড তথা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও ছিল লক্ষণীয়।

প্লাবিত বিধ্বস্ত এলাকায় দেখা গেছে বেড়ীবাঁধ ভাঙ্গনের পর থেকে যে পরিবার যে অবস্থানে ছিল সে পরিবার ঠিক সেই একই অবস্থানে রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া মানুষগুলো আজও বাড়ি ফিরতে পারেনি। বাড়ি ফিরে বা কি করবে ভিটে আছে তো মাটি নেই, বেড়া নেই তো চাল নেই, চুলো নেই তো ঘর নেই। প্লাবিত বিধ্বস্ত তাণ্ডবের চিহ্ন হিসাবে ডুবুডুবু অবস্থায় কোন কোন স্থানে বসতঘরের অংশবিশেষ থাকলেও সেখানে বসবাসের উপযোগী নয় বলে লক্ষ্য করা গেছে।

যার প্রেক্ষিতে আজও বাড়ি ফিরতে পারছে না বেড়ীবাঁধের উপর বসবাসরতরা, আয়ের শেষ সম্বল নদীতে মাছ ধরা নৌকায় এবং টোং বেঁধে রাস্তায় বসবাসরত পরিবারগুলো বাড়ি ফেরা নিয়ে রয়েছে খুবই দুশ্চিন্তায়। যে পরিবার যেমন তার ক্ষতির মাত্রাও তেমন। ভুক্তভোগী বানভাসি স্থানীয়রা হয়ে পড়েছে বেকার। নেই কৃষি কাজ, নেই ক্ষেত-খামার নেই ঘরবাড়ি সব কিছুই অনিশ্চিত ও সম্ভাবনায়। কবে হবে বাঁধ, কে বা জানে।

প্রতাপনগর হরিশ খালির বাঁধের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নিয়োগকৃত ঠিকাদারের চলমান বাঁধ নির্মাণ কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে আসলে ঠিকাদারের পরামর্শ উপেক্ষা করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেনের পরামর্শে তাৎক্ষণিক বাঁধ চাপান দেয়া হয়। দুর্ভাগ্য জনক সত্য কথা এই যে বাঁধটি ৬ ঘন্টাও স্থায়ীত্ব হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষগুলো রয়েছে খুবই হতাশায়।

ইতোপূর্বে শ্রীপুর কুড়িকাহনিয়া, চাকলা, হরিশ খালির পশ্চিম মাথা, সুভাদ্রাকাটিসহ বিভিন্ন স্থানের রিং বাঁধের, কাজ স্থানীয়রা বেধেছে। প্রলয়ঙ্করি ঘুর্নিঝড় আম্ফান ঝড়ের পূর্বাভাস বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিস তথা ইলেকট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী এবং উপকূলবাসী জানতে পারায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও ক্ষতির মাত্রা ছিল সীমাহীন।

খামারিরা হারিয়েছে তাদের সাজানো স্বপ্ন। মৎস্য চাষীর হারিয়েছে তাদের হাজার হাজার টাকার মাছ। চাষিরা হারিয়েছে তাদের ফসল ভরা মাঠ সবকিছু মিলিয়ে যেন শূন্য মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে পুরো এলাকাটি। এদিকে ত্রাণ কেউ পাচ্ছে, কেউ না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। নিম্ন মধ্যবিত্তরা রয়েছে-বলেই বিপাকে। না পারে ত্রাণ চাইতে না পারে দুঃখের কথা কারো কইতে। এহেন পরিস্থিতিতে সর্বোপরি অবস্থার দৃষ্টিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড তথা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্লাবিত বানভাসি সর্ব শ্রেণী পেশার মানুষের একটাই দাবী আমরা ত্রাণ চাইনা,চাই টেঁকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *