ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত সবুজ বেষ্টনী : মরতে শুরু করেছে বনাঞ্চলের গাছপালা

এস,এম,হাবিবুল হাসান :
সাতক্ষীরার আশাশুনিতে সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে গোটা উপকূল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছপালা। ঢেউয়ের তান্ডবে উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছপালা। সাগরপাড়ে সুন্দরবনের কোলঘেষে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। পশ্চিমে কপোতাক্ষ নদ আর পূর্বে খোলপেটুয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত এ ইউনিয়টি সবুজে সবুজময়। ছোট ছোট গ্রামগুলো ছবির মতো। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, এ গ্রামেই গত ২০ মে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন ঘূৃর্ণঝড় আম্পান। সেই আঘাতের জের কাটিয়ে উঠেনি এখনো। আম্পানের আঘাতে গোটা ইউনিয়ন যেনো ধ্বংসস্তুপ। বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত। নোনা পানির প্রভাবে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে গাছপালা। অনেক গাছ এখন মরতে শুরু করেছে। গাছের মূলে বালু জমে ও লবণ পানিতে বিবর্ণ হয়ে গেছে গাছের কান্ড ও পাতা। আম্পানের দীর্ঘ সময় চলা ঝড়ো বাতাসে গাছগুলোর এমন দশা হয়েছে। একারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এ বনাঞ্চল সংলগ্ন পরিবারগুলো। যেসব গাছ পানি সহ্য করতে পারেনা সেসব গাছ মরে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা ঠিক যেন ছবির মতো সাজানো গোছানো ছিল উপজেলার প্রতাপনগর, আনুলিয়া, শ্রীউলা ইউনিয়নসহ আশাশুনির ১১টি ইউনিয়ন। গাছঘেরা ইউনিয়নগুলো যেন প্রকৃতির সবুজ দেয়াল। আম্পানের ঝড়ের তান্ডবে সেই প্রকৃতির সবুজ দেয়াল এখন বিলীন হয়ে গেছে। যে কয়টি গাছ উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাও মরতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম্পানের দীর্ঘ সময় ধরে চলা ঝড়ো বাতাস ও সামুদ্রিক লবণ পানির স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে গাছের শ্বাসমূল শোষণ করায় গাছগুলো মরে যাচ্ছে।
জানা গেছে, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রের প্রচন্ড ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনাঞ্চল। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র তান্ডব থেকে এই বন উপকূলকে রক্ষা করেছে। সেই দুর্যোগে বড় ধরণের ক্ষতির শিকার হয়েছিল বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। বনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বন্যপ্রাণির ক্ষতি হয়েছে অনেক।

স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, এলাকা রক্ষায় দেয়াল হিসেবে কাজ করেছে বনাঞ্চল, ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ও সবুজ বেষ্টনী। এখন সেই বন নেই। সেই গাছপালা নেই। নেই সেই সবুজের সমারোহ।

একই এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম হোসেন বলেন, আম্পানের ঝড়ো বাতাসের তোড়ে সমুদ্র ঘেষা গাছগুলো যেন মুড়িয়ে দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, নারগিস, মোহাসেনসহ বড় বড় ঝড়কে মোকাবেলা করেছে এ বনাঞ্চল। বনাঞ্চল ছিলো বলেই ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার রক্ষা পেয়েছে।

জেলে আবুল কাশেম মোড়ল বলেন, আইলার পর গত ৫/৬ বছর ধরে এ অঞ্চলের গাছপালা বিলীন হতে চলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আম্পানের ঝড়ো হাওয়ায়। নদী সংলগ্ন বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ উপড়ে গেছে।

পরিবেশবিদরা বলেছেন, বন ও বনের গাছ পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়ের কবলে যেভাবে বন ও সবুজ বেষ্টনী ধ্বংস হচ্ছে, এর ফলে পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে মানুষের ওপর। সাগরের নোনা জলের প্রভাবে কৃষিতে প্রভাব পড়ছে। গ্রামগুলো পানিতে ডুবে থাকায় আবর্জনা পচে দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পচা পানির কারনে গায়ে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। সুপেয় পানির অভাব প্রকট আকার ধারন কেরেছে।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন বলেন, প্রতাপনগর ইউনিয়নে মোট জনসংখ্যা ৩৫ হাজার ৭শ’৫৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ১৮ হাজার ৫শ’৫৫ জন এবং নারী ১৭ হাজার ২শ’ জন। শিশু রয়েছে ৮ হাজার ১শ’৩৩ জন। পরিবারের সংখ্যা ৭ হাজার ৩শ’৫০টি। কৃষি জমির পরিমাণ ৮শ’৭৫ হেক্টর। এরমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি জমির পরিমাণ ৮শ’ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য প্রকল্পের পরিমাণ ১হাজার ৯শ’২০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত গবাদি পশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৩শ’১৫টি। রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে ৪০ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার। কৃষি ও মৎস্য সম্পদের সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পোল্ট্রি ফার্মের ক্ষয়ক্ষতি ৯৯ শতাংশ। আম্পানের প্রভাবে ইতোমধ্যে গাছপালা মরতে শুরু করেছে। এমনিতেই আম্পানের আঘাতে ভেঙেছে অসংখ্য গাছ। উপড়ে গেছে উপকূলের দেয়াল সবুজ গাছপালা।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালের আইলার পর থেকে মাটিতে শক্তি কমে গেছে। মাটির গঠন পরিবর্তন হয়ে আঠালোভাব আর নেই। ফলে বেড়িবাঁধ টেকসই হয় না। তিনি বলেন, বেড়িবাঁধের গা ঘেঁষে মাছের ঘের করার কারণেও বাঁধ ও রাস্তা নষ্ট হচ্ছে। তাই বেড়িবাঁধ থেকে কমপক্ষে ১শ’ ফুট দূরে টেকসই রিংবাঁধ দিয়ে মাছের ঘের করার জন্য তিনি দাবি জানান। তিনি বলেন, চাকলা, কুড়িকাহুনিয়া ও হিজলিয়া কোলা এলাকার বেড়িবাঁধ বাঁধার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হরিষখালি বেড়িবাঁধ বাঁধার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কবে বাঁধা হবে বাঁধ তার কোন কিছুই আমরা আন্দাজ করতে পারছি না। জোয়ার-ভাটার মধ্যে আমরা ডুবছি আর ভাসছি। আর কতদিন এভাবে ভাসতে হবে আর ডুবতে হবে তা অজানা। আমরা আর ভাসতে চাইনা। আমরা আর ডুবতে চাই না। আমরা টেকসই স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই।

এদিকে আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর আলম লিটন বলেন, তার ইউনিয়নে ১৩টি পয়েন্টে ভেঙে গেছে। আদি বিছট গ্রাম ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিছট, নয়াখালি, কাকবাশিয়া ও মনিপুরি গ্রামের প্রায় ২শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্ষতি হয় বাঁধভেঙে। শতশত পরিবার পানিবন্ধী। নোনা পানির প্রভাবে মরে যাচ্ছে গাছপালা। তিনি বলেন, বাঁধ বাঁধলেই হবে না, বাঁধ রক্ষা কমিটিও করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে সম্পৃক্ত করে বাঁধরক্ষা কমিটিকে শক্তিশালী করতে হবে। ব্লক সিস্টেমে নিচ থেকে ডাম্পিং করতে পারলে বাঁধ টেকসই হবে বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *