প্রাথমিক শিক্ষায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দীক্ষা-

মোঃ লিয়াকত আলী সেখ,উপজেলা নির্বাহী অফিসার ,শেরপুর, বগুড়া::

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দূষণহীন পরিবেশে বাস করতে কে না চায়? বলা হয়ে থাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের স্বভাবজাত প্রেরণা। তাই স্বভাব যদি বিকৃত না হয় তাহলে মানুষ নিজেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে এবং চারপাশের পরিবেশ ও লোকজনকেও পরিচ্ছন্ন দেখতে ভালবাসে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলতে কেবল বাহ্যিক পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাকেও বুঝায় না বরং এটি বাহ্যিক চেহারার চেয়ে আরও বেশি কিছুকে বোঝায়। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের জন্য এটা হল এক সর্বজনীন নীতি। সেইসঙ্গে এটা মনের এবং হৃদয়ের এক অবস্থা, যার সঙ্গে আমাদের নৈতিকতা এবং উপাসনা জড়িত।

প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের শিক্ষার ভিত্তি হওয়ায় এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। আবার মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে পরিচ্ছন্ন গ্রাম পরিচ্ছন্ন শহর বিষয়ে যে কর্ম্পরিকল্পনা প্রনয়ণ করা হচ্ছে সেখানেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসডিজিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে তবে তা সকলেরই কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জনাব মোঃ আকরাম-আল-হোসেন স্যার লিখিত নির্দেশনা নিয়ে পরিপত্র জারী করেন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশ বান্ধব প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয় ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে।
এই নির্দেশনা অনুসারে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না করে প্রতি বৃহস্পতিবার দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রধান শিক্ষক এ কার্যক্রমের ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। এতে স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এই কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু স্কুলই নই, স্কুলে গড়ে তোলা অভ্যাস বা অনুশীলন তারা বাড়িতে বা চারপাশ পরিষ্কার রাখার দীক্ষা পাবে। যা তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শিক্ষার্থীর মনে স্কুল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে, বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তোলে। শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করে দায়িত্বশীল হতে সহায়তা করে।
এলার্জি, হাপানি, এজমা, ডেঙ্গু প্রভৃতি রোগ থেকে দূরে রাখতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সাহায্য করে। শিক্ষার্থীদের অসুস্থ্যতার হার কমিয়ে বিদ্যালয়ের উপস্থিতি বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যেখানে সেখানে ম্যলা-আবর্জনা না ফেলে বরং নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফেলার শিক্ষা পেলে তা শিক্ষার্থিদের অনেক কাজ দিবে। এটি তাদের চর্চা ও অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত হবে। এটি সমাজ-সংস্কারের জন্য অনন্য ভূমিকা পালন করবে। বিদ্যালয়ে অর্জিত এই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়েই শিক্ষার্থীগণ রাস্তাঘাট বা যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকবে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা সচেতনতা বাড়লেও এখনো পরিবেশের পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। শিক্ষার্থীরা এখনো শ্রেণিকক্ষের পাশে রেখে দেয়া ঝুড়িতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে বরং শ্রেণিকক্ষে বা বারান্দায় বা মাঠে বা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলছে। আবার স্কুলের এক কোণায় ময়লা আবর্জনা ফেলে স্তুপ করে ফেলা হচ্ছে।

সুতরাং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সপ্তাহের এক দিনে না করে প্রতিদিনই করা উচিত। বিদ্যালয় ছুটির আগ মুহূর্তে সবগুলি ঝুড়ির ময়লা একজায়গায় করে পুড়িয়ে ফেলা যেতে পারে। প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এসেম্বলিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এছাড়াও অভিভাবক সমাবেশেও অভিভাবকদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে যাতে বাড়িতেও শিক্ষার্থীগণ এ বিষয়ে আন্তরিক থাকে। প্রত্যেক ক্লাশ থেকে একজন করে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিয়ে তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাস পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান পরিচালনা করবে। শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাসসহ সার্বিক পরিবেশ পরিস্কার-পরিছন্ন রেখে বিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলের সম্বেত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।এজন্য বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদেরকেও এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য মনিটরিং করা দরকার। আর এজন্য উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি, উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সদস্য-সচিব এবং উপজেলার বিভিন্ন অংশীজন নিয়ে একটি পরিবীক্ষণ কমিটি করা যেতে পারে। কমিটি দুই বা তিন মাস পর পর সভায় মিলিত হয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ বা পরামর্শ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে। এছাড়া কিমিটির সদস্যগণ নিয়মিত বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শনপূর্বক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে দিক-নির্দেশনা দিবেন।

পরিচ্ছন্ন রুচি তৈরি করা পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের জন্য পরিচ্ছন্ন রুচি অপরিহার্য। পক্ষান্তরে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন রুচি মানুষকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে সহায়তা করবে। এজন্য ছোট থেকেই শিশুদের মধ্যে ভদ্র, শালীন, সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন রুচি গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত।আর এজন্যই আমাদের বিদ্যালয় এবং এর চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আর পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়ে প্রাপ্ত দীক্ষা নিয়ে বড় হবে আমাদের শিশুরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *