ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে লন্ডভন্ড সাতক্ষীরা : পরিদর্শনে বিভাগীয় কমিশনার

এস,এম,হাবিবুল হাসান : সাতক্ষীরায় সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে গোটা জেলা। উপকুলীয় চারটি উপজেলার কমপক্ষে ২৩ টিরও বেশী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। পানিতে ভেসে গেছে হাজার হাজার বিঘা মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি। বিধ্বস্ত হয়েছে সহস্রাধিক কাঁচা ঘর বাড়ি। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে অনেক রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরার ব্রান্ড খ্যাত আমের। এদিকে, শহরের কামাননগরে গাছ চাপা পড়ে করিমন নেছা (৫০) নামের এক নারী মারা গেছে। বাকালে মারা গেছে শিক্ষক শামছুর রহমান (৬০)। এছাড়া আশাশুনির প্রতাপনগরের কুলতিয়া গ্রামে প্রতাপ ঘোষ (৫৫) নামের আরো এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গবুরা ও আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েকটি স্পটে কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউলখোলা এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২শ’ ফুটের মত এলাকা ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া কামালকাটি ও চন্ডিপুর এলাকায় পানি ওভার ফ্লো হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। এছাড়া গাবুরা ইউনিয়নের জেলেখানি ও নাপিতখালী এলাকায় বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রকাটি, কুড়িকাউনিয়া, চাকলা, হিজলা, দিঘলাররাইট, কোলা ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি ঢুকছে বলে নিশ্চিত করেছেন আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা। সেগুলি মেরামতের চেষ্টা চলছে।

সাতক্ষীরা জেলার প্রায় সব এলাকায় কমবেশী গাছপালা ভেঙে পড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় গাছ পড়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের তারের ওপর গাছ পড়ায় এবং খুটি উপড়ে পড়ায় জেলায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিসেবা। অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ী ও টিনের চাল উড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, ঘন্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার গতিবেগে বিকেল ৪টার পর থেকে সুন্দরবন উপকুলে আম্পান আছড়ে পড়ে। এরপর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত ১৪৮ কিলোমিটার গতিবেগে পশ্চিম দিকে ঝড়ো হাওয়াটি জেলা শহরের ওপর আঘাত হানে।

এদিকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম আবুজর গিফারী জানান, আম্পনের কারনে নদীর পানি ৩ থেকে ৪ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে নদীর প্রবল জোয়ারে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের দাঁতনেখালি, দূর্গাবাটি, পদ্মপুকুর ও গাবুরার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ভেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। কয়েকটি স্থানে ওভারফ্লো হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত করে। কাঁচা ও টিনের ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছ-গাছালি উপড়ে রাস্তা-ঘাট ও বাড়ী ঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে ১৪৫টি সাইক্লোন সেল্টার ও ১ হাজার ৭শ’ টি স্কুল-কলেজসহ আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। জেলায় ১২ হাজার সেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি ১শ’৩ জনের মেডিকেল টিম স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

মরিচ্চাপসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ২ থেকে ৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ও গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার দয়ারঘাট, হাজরাকাটি, কুড়িকাউনিয়া, মনিপুরি ও বিছট এলাকার ভেড়িবাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সাথে নিয়ে তালিকা তৈরির কাজ করছে। তাদের কাছ থেকে তালিকা পেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানা যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলো জরুরী সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জানান জেলা প্রশাসক।

এছাড়াও শুক্রবার(২২ মে)দুপুরে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালীতে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করতে যান।

এসময় তিনি বলেন,ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারনে ভেঙ্গে যাওয়া ভেড়িবাঁধ মেরামতে কাজ করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আর ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাধ পরিদর্শন করে তা দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার।

এ সময় ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার আরো বলেন, খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বেড়িবাঁধ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেনাবাহিনীকে এই তিনটি জেলার বেড়িবাধ মেরামতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সঙ্গে ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল, শ্যামনগর উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আতাউল হক দোলন, ইউএনও আ ন ম আবুজর গিফারী প্রমূখ। পরে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। পরে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কলারোয়া উপজেলায় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ঢেউ টিন বিতরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *