সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে তালের রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা

এস,এম,হাবিবুল হাসান : সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে তালের রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। গ্রীষ্মে মনকে সতেজ, ঠান্ডা আর ভাল ঘুম আনতে তালের রস বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

গ্রীষ্মের শুরুতে কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের মোজাম সরদার নামে এক গাছি ৮-১০টি তাল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেছেন।সেই গুড় থেকে পাটালি ও বিভিন্ন মিষ্টি-মিঠাই তৈরী করা জয়।

এছাড়া উপজেলার কালিয়াকাপুর, মৌতলা, রতনপুর, নলতা, তারালী, কুশলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার গাছিরা তাল গাছে বাঁশ বাধা শুরু করেছেন যাতে তাড়াতাড়ি তালের রস সংগ্রহ করতে পারেন।

গাছি মোহাম্মাদ আলী বলেন, তালের রস থেকে গুড় সংগ্রহ করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও বিকালে তিন ধাপে তাল গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া তালগাছে গুলি (রসের পাত্র) পেতে রাখার সময় তাল গাছের মৌচা বা খাদি সামান্য অংশ কেটে ফেলতে হয়। যে তাল গাছে তাল ধরে না তাকে জটা তালগাছ বলে। সাধারণত জটা গাছ ও যে গাছে তাল ধরে, উভয় গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়।গরম যত বেশি হবে, তাল গাছের রস তত বেশি হবে। তারা আরও জানান, প্রতিদিন সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়কের দুদলীয়া, রায়পুর মোড়ে তারা তালের রস বিক্রয় করেন।

কালিগঞ্জ উপজেলার জিরোনগাছা গ্রামে রাস্তার ধারে হাবিবুর রহমান নামে এক বলেন, গরমের শুরুতে আমি ৯টি তালগাছ পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করি। বর্তমানে ৯ টি গাছ থেকে কম বেশি রস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি তাল গাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ লিটার রস পাওয়া যায়। আমি প্রতিদিন দুপুর ও সন্ধ্যায় স্থানীয় বাজারে প্রতি গ্লাস রস ৫ টাকা করে বিক্রয় করি। প্রতিদিন সব মিলে প্রায় ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকার রস বিক্রি হয়।চলতি রাস্তায় পথচারী ও স্থানীয়রা সেই রস কিনে কেউ খেয়ে যায় আবার কেউ কেউ সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

নাম না জানা কয়েক জন তালের রস ক্রেতা বলেন,আমরা চলতি পথে যখনি তালের ররস চোখে পড়ে আমরা খেয়ে যায় আবার সঙ্গে করে পরিবারের জন্য নিয়ে যায়। এখানকার তালের রস ভেজাল মুক্ত, সতেজ, মিষ্টি ও সুস্বাদু।

কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী জানান, এক সময় তাল রসের খ্যাতি থাকলেও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তালের রস ও গুড়। কয়েক বছর আগেও উপজেলার বিভিন্ন ক্ষেতের আইলের পাশে, রাস্তার দুই ধারে ছিল অসংখ্য তালগাছ। তাল গাছ সারা বছর অযত্মে অবহেলায় পড়ে থাকলেও গ্রীষ্মের মৌসুমে কদর বেড়ে যায়। তালের রস সুস্বাধু ও মানব দেহের উপকারি হওয়ায় মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় এই রস।

তিনি আরো বলেন, বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রাণহানির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধসহ প্রাণহানি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া তালগাছ দীর্ঘদিন জীবিত থেকে মানুষের উপকার করে। তালগাছ থেকে ঘর নির্মাণের মূল্যবান কাঠ ও জ্বালানি পাওয়া যায়। এ গাছ রস ছাড়াও কাঁচা ও পাকা সুস্বাদু ফল দিয়ে থাকে। বজ্রপাত প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এবং আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ রোপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে কালিগঞ্জ উপজেলায় ১ লক্ষ তালের চারা রোপণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ২০ হাজার তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং এবছর বাকি তালের চারা রোপন করা হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুহুল আমীন বলেন, কালিগঞ্জ উপজেলা একটি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। বৃষ্টিপাতের সময় এ এলাকায় বজ্রপাতও হয় প্রচুর। বজ্রপাতে মানুষসহ অনেক পশু-পাখি মারা যায়। ক্ষতি হয় মূল্যবান গাছ-পালাও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উঁচু গাছেই বেশি বজ্রপাত হয়। উঁচু গাছ থাকলে এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানি লাঘব হয়। বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য উঁচু তালগাছই সবচেয়ে কার্যকর। আমরা প্রতি বছর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তারের পক্ষ থেকে উদ্বুদ্ধকরণের অংশ হিসাবে রাস্তার পাশে বজ্রপাত প্রতিরোধে তালের চারা রোপণের উদ্যোগ নেই। যা রসের চাহিদাও মেটায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *