তথ্যপ্রযুক্তি সোস্যাল জার্নাল; আমাদের দায়বদ্ধতা

এস কে দোয়েল:
যশোরের মনিরামপুরের এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসান কর্তৃক সরকারি নিদের্শনা না মানার দায়ে তিন বৃদ্ধকে কানে ধরে উঠবস নিয়ে সোস্যাল নেটওয়ার্কে ভাইরাল হওয়া বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে একটি মন্তব্য স্টেটাস দিয়েছিলাম। আমি অন্যায়কে অন্যায় বলি, ভালোকে ভালোই বলি। সে স্টেটাসে এক ফেসবুক বন্ধু মন্তব্য করেছিলেন এরকম “ছবি কিন্তু উনি তুলেছেন ঠিক আছে, কিন্তু উনার ছবিটা কে তুললো”। এসিল্যান্ডকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে কীনা জানার আগ্রহ ছিল তার। রাষ্ট্রের প্রদত্ত আইন মানা প্রতিটি নাগরিকের জন্য যেমন ফরজ। তেমনি আইন প্রয়োগকারীর ক্ষেত্রেও অনেক কিছুই নির্ভর করে তিনি সে আইনটি কিভাবে প্রয়োগ করছেন। সে যাক, পরে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তিন বৃদ্ধকে কানে ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করার দায়ে এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আরেকটি বিষয়, আমাদের বাঙালিরা যে নিয়মনীতি মেনে চলি, তাও কিন্তু নয়। সেদিক আইনের কঠোরতাও অবশ্য অনেক সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

বিংশ শতাব্দির যুগে সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছে আজকের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিজ্ঞান। কোন কঠিনই কঠিন নয় আজ। এই প্রযুক্তির যুগে অতি সহজে যেকোন তথ্য, অধিকার, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে অনলাইন প্লাটফর্ম প্রাগৈতিকহাসিক চিন্তাধারাকে বদলে দিয়েছে। মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখন হাতের স্পর্শে প্রযুক্তির বাটনে অনুভূতি প্রকাশ ঘটে। যেকোন বিষয় এখন গোপন রাখা দু:সাধ্য হয়ে উঠেছে। সব আড়ালই যেন ফোকাসে চলে আসছে। কারণ কি? কারণ হচ্ছে প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার। সবদিকে তাক করে আছে প্রযুক্তির চোখ। অগণিত মানুষের হাতে নানান ব্রান্ডের ক্যামেরা ফোন। এ ফোনগুলোর মধ্যে আইফোন কিংবা স্মার্টফোন। মিনি কম্পিউটার মনে করা হয় স্মার্টফোনকে। যার উঁৎকর্ষে, ইন্টারনেট প্রোর্টেবলে সাহায্যে খুলে গেছে গুগলে ভূগোল। আগে মানুষ পৃথিবী জানতে ভূগোল পড়তো। এখন মানুষ গোটা বিশ্বের তাৎক্ষণিক কোন কিছু জানতে গুগলে ভূগোল পড়ে। এই গুগল-ভূগোলে নেটওয়ার্কিং সিস্টেমে যোগ হয়েছে সোস্যাল কমিউনিটি নেটওয়ার্ক। যেটাকে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, টুইটার, বেশতো, লিংকডিন এর মতো কমিউনিটি নেটওয়ার্ক বুঝে থাকি।

বিংশ শতাব্দির চলমান ২০২০ পা না পড়তেই চীনের উহান প্রদেশ হতে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাস এক বিস্ময়করভাবে বিশ্বকে মৃত্যু আতঙ্কে পরিণত করেছে। অস্ত্রবিহীন এক ভয়ংকর শত্রুর সাথে লড়াই করছে বিশ্ব। যার প্রতিটি মুুহুর্তের খবর মানুষ জানতে পারছে মানুষ আজ ফেসবুক, অনলাইন নিউজপোর্টাল,টেলিভিশনের মাধ্যমে। এসব খবর পাওয়ার সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট প্রোটেবল যুক্ত স্মার্টফোন। বিশ্বে যে যেখানেই আছেন, সেখান হতেই সেখানকার সদ্য ঘটিত ঘটনা জানাতে পারছেন সোস্যাল নেটওয়ার্কের কারণে। আর যেকোন ঘটনার উপর নিজস্ব মতামত, পরিস্থিতি, অনুভূতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম সোস্যাল মাধ্যম ফেসবুক। শখের স্মার্টফোনে কখনো এমন কিছু দৃশ্য ধারণ হয়ে পড়ে, যা কখনো সে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ হয়ে উঠে। তাই একজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী অতি সহজেই যেকোন ঘটনার ছবি তুলতে পারেন। হোন তিনি সংবাদকর্মী কিংবা সাধারণ কোন নাগরিক। তিনি যেকোন ঘটনার স্বাক্ষী যেমন হতে পারেন, তেমনি বিভিন্ন ঘটনার তথ্য সংগ্রাহকও হতে পারেন।

সোস্যাল মিডিয়াকে এখন শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম মনে করা হয়। যেকোন তাৎক্ষণিক ঘটনা, সংবাদ ও প্রকাশের জনপ্রিয় মাধ্যমই হচ্ছে সোস্যাল নেটওয়ার্ক ফেসবুক, টুইটার। এটাকে সোস্যাল জার্নাল হিসেবেও পরিচিত। সোস্যাল কমিউনিটি নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যমের প্রিন্ট ও অনলাইন, রেডিও, টেলিভিশনের পেইজ লিংক। এসব পেইজ লিংক লাইক দিয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারী সার্বক্ষণিক ঘটনাসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে পাচ্ছেন। তাছাড়া ফেসবুকের নিউজফিডের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের সাথে সব ফ্রেন্ডসার্কেলের স্টেটাস/পোস্টটি পছন্দ হলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে ভাইরাল করতে পারেন। প্রয়োজনে সে পোস্টটি নিজের টাইমলাইনে সংরক্ষিত করে রাখতে পারেন কিংবা বিতর্কিত হলে পোস্টটি স্কিনশট নিয়ে রাখতে পারেন। এ কারণে প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে সোস্যাল মিডিয়া দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। গণমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে এ সোস্যাল জার্নালকে।

গণমাধ্যমে নাগরিক সাংবাদিকতা বলে নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়েছে। যেকোন সচেতন নাগরিক স্বতস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের খবর ও তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশগ্রহণ মূলক ভূমিকাই হচ্ছে নাগরিক সাংবাদিকতা। এসব সচেতন নাগরিকরা বিভিন্ন গোপন তথ্য প্রদান করে কোন ইনভেস্টিগেশন শুরু বা শেষ করতে সাহায্য করেন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া যেকোন ঘটনা, স্থানীয় সমস্যা ও সাফল্য নিয়ে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে একজন নাগরিক সাংবাদিকের। যদিও তারা প্রফেশনাল সাংবাদিকদের মতো দায়িত্ব পালন করেন না। তাদের বিভিন্ন সময় তাদের কাছে আহরিত খবর সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। সংবাদের আদলে না হলেও নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে তা প্রকাশ করতে পারেন। যার কারণে এ প্রবন্ধ লেখার শুরুতেই ‘যশোরের মনিরামপুরের এসিল্যান্ডের তিন বৃদ্ধকে কান ধরে উঠবস সাজা ও ছবি তোলা’ বিষয় নিয়ে শুরু করেছিলাম। সেখানে এক ফেসবুকার যে মন্তব্য করেছিলেন, এসিল্যান্ডের ছবিটি তাহলে কে তুলেছিলেন? এই ছবিটি ঘটনাস্থলের উপস্থিত থেকে সবার অগোচরেই কোন সচেতন নাগরিক তার স্মার্টফোনের ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছিলেন। পরে সে ছবিটি স্থানীয় সাংবাদিকদের দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। এটাই হচ্ছে নাগরিক সাংবাদিকতা। প্রত্যক্ষভাবে কোন ঘটনাস্থলে সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকতে না পারলেও কোন সচেতন ও সাহসী নাগরিক সে কাজটি করে অন্যায় সাজার চিত্র তুলে একজন সচেতন নাগরিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন।
আমরা সাম্প্রতিক সময়ে অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সোস্যাল জার্নালের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। পরে সে চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সদ্য সংঘটিত কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কর্তৃক অনলাইন নিউজপোর্টাল ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের উপর মধ্যরাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মারধর, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলহাজতের ঘটনা, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা, এটি বাংলাদেশে একটি সবচেয়ে নৃশংস ও লোমহর্ষক ঘটনা। জঙ্গিদের নারকীয় তান্ডব ও জঘন্য হত্যাকান্ডের দৃশ্য সর্বপ্রথম ফেসবুকে জানতে পেরেছি। সিলেটে কিশোর রাজন হত্যার ঘটনা ভুলিনি কেউ। পাষন্ডরা পায়ুপথে পাম্প করে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে রাজনকে হত্যা করে পাষন্ডরা। সেই হত্যাকান্ড চিত্র সর্বপ্রথম ফেসবুকে প্রকাশ পায়। কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যা, পুলিশ সুপারের স্ত্রীকে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা-দুর্ঘটনা মানুষ প্রথম জানতে পারে সামাজিক যোগযোগের মাধ্যমে। প্রতিনিয়ত সোস্যাল র্জানালে তুলে ধরছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নাগরিকরা।

এখন কথা হচ্ছে, ফেসবুক তো সব ঘটনা সবার আগে জানানোর একটা উন্মুক্ত মাধ্যম তৈরি করেছে। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে বিশ্বে কোথায় কি ঘটছে তা জানতে পাচ্ছি। চোখের সামনে, চারপাশে কি ঘটছে সেটাও আমরা জানাচ্ছি। তা ভাইরাল করে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারছি। কারো গোপন ভিডিও কৌতুহলে দেখছি, শেয়ার করছি। প্রয়োজনে সংগ্রহ করে রাখছি। তবে আমরা এ সোস্যাল জার্নালে যা কিছুই করছি না কেন। তা কিন্তু প্রত্যেকেই প্রযুক্তির নজরদারিতে রয়েছি। এ বিষয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু তা কিন্তু প্রত্যেকের জানা প্রয়োজন। শুধু এক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের দায়বদ্ধ রয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, সোস্যাল জার্নাল এমন একটি নেটওয়ার্ক, যা মানুষকে উপকারও করে, আবার চরম ক্ষতির দিকেও নিয়ে যায় এমনকি কখনো নিজের সামান্য ত্রুটির কারণে জীবনটাই হুমকির মুখোমুখি হয়ে উঠে। তাই কোন অসত্য তথ্য, বিভ্রান্তিকর কোন ফেসবুক পোস্ট, শেয়ার, ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে জন-গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং ব্যক্তির মর্যাদাহানীকর কোনো বিষয়ে প্রকাশ ও প্রচার থেকে বিরত থাকা, নিজের বিবেকের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাই হচ্ছে আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। চলমান করোনা ভাইরাস নিয়ে কোন প্রকার কানকথা, গুজব, বিভ্রান্তিকর কিংবা ব্যঙ্গ কোন মতামত প্রকাশ করা সাইবার ক্রাইম কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির আইনে অভিযুক্ত না হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া যেমন আবশ্যক। তেমনি দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে উপকারে আসে সে বিষয়ে সোস্যাল জার্নাল ব্যবহার করাও দায়িত্বশীলতায় রাখা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
এস কে দোয়েল
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সংগঠক
তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *