করোনা আক্রান্ত ইটালির রোম শহরের সার্বিক পরিস্থিতি

শাহিন রানা,ইটালির রোম থেকে:

করোনা আক্রান্ত ইটালির রোম শহর থেকে সার্বিক পরিস্থিতি জানাচ্চিলেন শাহিন রানা।তিনিজন্ম সুত্রে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মিজাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দৈনিক দৃষ্টি প্রতিদিনকে বলেন-
আমি বিগত আট বছর কর্মসূত্রে থাকি ইতালির রোম শহরে। এটা ইউরোপের একটি অন্যতম অভিজাত আর প্রাচীন শহর। আমার মাতৃভূমির পর এই শহর আমাকে লালন পালন করেছে।

এটাই আমার দ্বিতীয় ভালোবাসার শহর। কিন্তু আজ আমার এই ভালোবাসার শহর ক্ষত বিক্ষত জর্জরিত করোনা নামক এক অজানা অচেনা শত্রুর কাছে। কিন্তু এ শহর পরাজিত নয় এই শহর আর আমরা সমগ্র শহরবাসী হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে চলেছি আর শপথ নিয়েছি আমরাই জিতবো ওই অচেনা শত্রু কে হারাবো আমরা।

এই কর্মসূচিতে আমাদের সাথে আছে এদেশের প্রশাসন। এখানকার প্রতিটি নাগরিক ইতালীয় সরকারের প্রতিটি নির্দেশ যথাযথ ভাবে পালন করে চলেছে অতি সুশৃঙ্খল ভাবে তারা প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র কেনা বেচা করছে। নিয়মানুসারে মাস্ক গ্লাভস ব্যবহার করছে সরকার প্রদত্ত নির্দেশ মতো সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছে সাধারণ যানবাহন চালু থাকা সত্ত্বেও খুব emergency ছাড়া কেউ রাস্তায় বের হচ্ছে না।

এই সুশৃঙ্খল নাগরিকদের সবরকম সুবিধার জন্য প্রশাসন এখানে অনেক রকম আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছে। বয়স্ক নাগরিকদের জন্য শিশুদের জন্য কিংবা সমস্ত নাগরিকের জন্য বাজার খরচ হিসেবে কিছু অর্থ দিচ্ছে প্রশাসন।

এছাড়াও সামগ্রিকভাবে চুক্তির ভিত্তিতে যারা কাজ করতে আসে এদেশে কিংবা যারা এখানে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে আসে তাদের প্রত্যেকের জন্য, তাদের নির্ধারিত আয়ের কিছু শতাংশ ভাতা দেওয়া হবে এমন ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি যাদের কাছে এদেশে থাকার বৈধ কাগজপত্র নেই তাদের জন্যও এদেশের প্রশাসন খুব শীঘ্রই আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করতে চলেছেন যাতে সমাজের কোনো স্তরের মানুষ এই পরিস্থিতিতে অসহায় বোধ না করে বা তাদের খাদ্য বাসস্থান কিংবা চিকিৎসার কোনো অভাব না ঘটে।

বিশ্বের সবাই জানে ইতালিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষাধিক এবং এ যাবৎ মৃতের সংখ্যা প্রায় বাইশ হাজার। সংখ্যাগুলো অবশ্যই অস্বস্তিকর যা অবশ্যই চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। তবুও আমরা এতো সহজে হার মেনে নেবো না এই ব্রতে ব্রতী এদেশের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী তারা নিরন্তর চিকিৎসা দিয়ে চলেছেন রোগীদের।

অন্যান্য সকল দেশের মতো এখানেও এই মুহূর্তে কোভিড-19 রোগীদের সর্বপ্রথমে চিকিৎসা চলছে। কর্মক্ষম অবসরপ্রাপ্ত সমস্ত চিকিৎসক এবং নার্সরা সবাই হসপিটালে ফিরে এসে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। শহরের সমস্ত বড় ছোট হোটেল মোটেল ক্যাসেল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছেন কোভিড রোগীদের সেখানে রেখে চিকিৎসা করা হোক এবং এভাবেই চিকিৎসা চলছে এমনকি বাড়িতে self quarantine এ রেখে ফোনে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজন অনুসারে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে আর্থিক বা চিকিৎসা জনিত সাহায্যই শুধু নয় যাতে কোনো অবস্থাতেই তাদের মনোবল ভেঙে না পড়ে তাই স্থানীয় পুলিশরা নাচ গান করে গৃহবন্দী মানুষের মনোবল বাড়ানো তথা একঘেয়েমি কাটানোর ব্যবস্থা করছে যেটা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য এবং এতে তাদের মানবিক দিকটিই পরিষ্ফূট এবং অবশ্যই লক্ষনীয়। এই সময়ে এতো সুশৃঙ্খল সরকারি ব্যবস্থাপনা অবশ্যই প্রত্যেকের মধ্যে আশার আলোর জোগান দিচ্ছে।

  • ইটালির রোম শহরে যে ভাবে সময় কাটচ্ছেন শাহিন রানা:

এটা বর্ননা করা সবথেকে কঠিন মনে হচ্ছে।চার দেয়ালের ঘরে বন্ধি আছি আজ প্রায় ৪০ দিন | আমরা ছয়জন। চার দেয়াল, ছাদ, আর আমি । কারণ সত্যি বলতে কি এরকম কর্মহীন জীবন কোনোদিন কাটানোর প্রয়োজন হয়নি হ্যাঁ তবে জীবনের প্রয়োজন সবথেকে আগে,তাই জীবনের টানেই যেমন কর্মমুখরতা তেমনই জীবনের টানেই আজ এই কর্মবিমুখতা।

তবে আমি এই সময়টাকে নষ্ট করতে নারাজ। সারাদিনের সময়টাকে আমি কিছু কিছু নির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করে নিয়েছি। বেশিরভাগ সময়ে আমি আমার ড্রাইভিং স্কুলের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকছি। কিছুটা সময় আমার পরিবারের জন্য রেখেছি তাদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা সময় কাটানো ছেলেকে পড়াশোনায় সাধ্যমতো সাহায্য করা, ছোট্ট মেয়ের হাসি হাসি মুখের গল্প শোনা বউ এর শাসন সেইসবই চলতে থাকে এই এক কলে।


আমার বাংলাদেশের কলেজ ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আমাকে সবসময়ই ভালো ভালো পিডিএফ লিঙ্ক দিয়ে পড়াতে উৎসাহ দেয় সেসব ও সময় পেলেই পড়ে নি।
এসবের ফাঁকে সোশ্যাল মিডিয়াতে কিংবা দেশ বিদেশের বাংলা ইংলিশ পত্র পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নিই। তার সাথে সাথেই কিছু কিছু নতুন পুরোনো বন্ধুদের সাথে, আত্মীয় পরিজনদের সাথে ফোনেই যোগাযোগ করে নিন।
মাঝে মাঝে গীটার টা হাতে নতুন কোনো সুর গুনগুন করা কিংবা অল্প অল্প নতুন পুরোনো রান্না এই সব ই আমার রোজনামচা।

  • বাংলাদেশবাসী বন্ধুদের জন্য সময় কাটানোর কিছু উপায়…..

আমার ব্যক্তিগত মতামত প্রতিটা খারাপ জিনিসের সাথে কিছু ভালো জিনিস ও আসে। আমাদের অনেকেরই প্রশ্ন এই রকম নেগেটিভ একটা সময়ে কিভাবে নিজেদের পজিটিভ রাখা যায়? এই সমস্যার খুব সহজ কিছু সমাধান আছে।

এই আপাত গৃহবন্দীকালীন পরিস্থিতিতে আমরা বাড়িতে বসে বসেই আমাদের আত্মীয় পরিজন দের সাথে ফোনে কথা বলতে পারি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অথচ মানসিক ভাবে আমরা সহজেই একে অন্যের কাছে থাকতে পারবো এই মাধ্যমে।
এই অবসর সময়ে বই পড়া যেতে পারে সে আপনি ধর্মীয় বই পড়ুন কিংবা কোনো ঐতিহাসিক বই বা কোনো গল্পের বই।
বাড়িতেই শরীর চর্চা করলে অনেক বেশি সতেজ থাকাও যাবে আবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যাবে এবং এতে একঘেয়েমিও কাটবে।
গান শোনা যেতে পারে,গান করা যেতে পারে। ছবি আঁকুন মনের আনন্দে। পাশাপাশি টিভি দেখা, ওয়েব সিরিজ দেখা,ঘরে থেকে সকলের সঙ্গে গল্প করা,খেলা সব কিছুই করা যেতে পারে। বাচ্চাদের সময় দিন বাবা মাকে সময় দিন।এই সময়ে বাজারে সব কিছু মনের মতো পাওয়া না গেলেও যেটুকু আপনি খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পেরেছেন তাই দিয়েই নতুন নতুন রেসিপি বানান।পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ভালো সময় কাটান। আপনার পুরোনো অভ্যাস গুলোকে এই সময়ে জাগিয়ে তুলুন যেগুলো হয়তো আপনি আপনার জীবনের দৈনন্দিন চাহিদার কারণে ভুলতে বসেছিলেন। তবে যে জিনিসটা এসবের মধ্যেও মাথায় রাখতে হবে যে, এই সমস্ত কিছুই করা যাবে কিন্তু যেটা করা যাবে না, তা হল কিছুতেই বাড়ির বাইরে পা বাড়ানো যাবে না। তবেই সম্ভব এই যুদ্ধ জয় করা।

শেষতঃ আমি আমার প্রিয় দেশবাসীর প্রতি কয়েকটি কথা বলতে চাই। প্রিয় দেশবাসীরা আমাদের এই মুহূর্তে করণীয় হলো দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং আমাদের সরকার আমাদের অভিভাবক তারা সর্বদা আমাদের ভালোর জন্যই চিন্তা করেন আমদের ও উচিত আমাদের প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখা তারা যা যা নির্দেশিকা জারি করেছে সেগুলো পালন করা। সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেক রকম খবর প্রতি নিয়ত পরিবেশিত হয় সেসবের মধ্যে বেশ কিছু গুজবও ছড়িয়ে থাকে সেসমস্ত আমদেরকেই যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার বিবেচনা করে নিতে হবে অযথা ভুল খবরে বিচলিত হবেন না। অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা কেই অনুসরণ করে চলুন। সবাই সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন আসুন আমরা সবাই মিলে এই অশুভ শক্তি কে হারিয়ে এক নতুন বলিষ্ঠ পৃথিবী গড়ে তুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *