ধুনটে ভূগর্ভস্থ আইন না মেনে ঘুষের বিনিময়ে নলকূপ স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান

ইমরান হোসেন ইমন, ধুনট (বগুড়া) থেকে:
বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ভূগর্ভস্থ বিধিমালা ও আইন না মেনে ঘুষের বিনিময়ে কৃষিকাজের নলকূপ স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। যত্রতত্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নলকূপ স্থাপনের লাইসেন্স প্রদান করায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎখাতে সরকারের কোটি কোটি টাকার ভর্তুকির পরিমানও বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া পাশাপাশি নলকূপ স্থাপন নিয়ে মারামারির মতো ঘটনাও ঘাটছে অহরহ। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ারও আশংঙ্কা করছেন ভুক্তভোগিরা।
জানাগেছে, এতদিন কৃষিকাজে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনে সরকারের কাছ থেকে কোন লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজন হতো না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নলকূপ রয়েছে। কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ২০১৮ সালে ভূগর্ভস্থ নতুন আইন ও ২০১৯ সালে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
বিধিমালা অনুযায়ি, কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনে উপজেলা পরিষদ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এ জন্য মৌজা ও মৌজাগুলোর নকশা, নলকূপ স্থাপনের সুনির্দিষ্ট স্থান, আশপাশে নদী, খাল ও বিল থাকলে তার অবস্থান উল্লেখ করে উপজেলা পরিষদে আবেদন করতে হবে। আবেদনে প্রস্তাবিত সেচ এলাকার চারপাশে অবস্থিত নলকূপগুলোর অবস্থান, পানি ধারক স্তরের অবস্থা, নিকটবর্তী অন্য নলকূপের দূরত্ব, ফসলের পরিমাণ ও বিবরণসহ প্রস্তাবিত সেচ এলাকার তথ্যও থাকতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর সরেজমিন এ সব তথ্য যাচাই শেষে লাইসেন্স ইস্যু করবে উপজেলা পরিষদ। এরআগে উপজেলা পরিষদ সেচ কমিটির সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে লাইসেন্স প্রদান করবেন।
কিন্তু এসব বিধিমালা ও আইন না মেনে ভুয়াকাগজপত্র ও পাশাপাশি একাধিক নলকূপ স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রদান করেছে উপজেলা পরিষদ। তবে লাইসেন্স প্রদানের আগে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) শেরপুর ও ধুনট অঞ্চলের ইন্সেপেক্টর মাসউদুল করিম রানা ও ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ। কিন্তু তারা সরেজমিন তদন্ত না করে নলকূপের লাইসেন্সের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেছেন। তবে এসব ঘুষের টাকা বিভিন্ন সেক্টরেও ভাগবাটোয়ারা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগিরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কালেরপাড়া ইউনিয়নের কান্তনগর গ্রামের সোবাহানের লাইসেন্সকৃত বোরিং অগভীর নলকূপ থেকে মাত্র ১০০ ফুট দূরত্বে এনামুল হকের নামে নতুন লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ও আইন অনুযায়ি নিকটবর্তী অন্য নলকূপের দূরত্ব থাকার কথা ছিল ৮২৫ ফুট। শুধু এনামুল হকের নামেই নয়, একইভাবে চিকাশী ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের শহিদুর আকন্দের ছেলে মহসীন আকন্দকে ২০০ ফুট দূরত্বে, পারলক্ষীপুর গ্রামের তফিজ উদ্দিন মন্ডলের ছেলে আসাদুল ইসলামেকে ২৫০ ফুট দূরত্বে, চিথুলিয়া গ্রামের রাজুর সংযোগকৃত সেচের পাশেই সজেদুল করিমকে ৫০০ ফুট দূরত্বে, শিয়ালী গ্রামের রফিকুল ইসলামকে পাশ্ববর্তী ওবায়দুলের সংযোগকৃত সেচ থেকে ৩০০ ফুট দূরত্বে, গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের মানিক পোটল গ্রামের নায়েব আলী ও মনোয়ারুল ইসলাম লিটনকে পাশাপাশি ২০০ ফুট দূরত্বে, গোপালনগর ইউনিয়নের চকডাকাতিয়া গ্রামের আফজাল হোসেন ও মোশারফ হোসেনকে পাশাপাশি মাত্র ১০০ ফুট দূরত্বে, বিসারদিয়ার গ্রামের শহিদুল ইসলামকে ২০০ ফুট দূরত্বে, ধুনট সদর ইউনিয়নের মাঠপাড়া গ্রামের রুহুল আমিন ও রকিবুল ইসলামকে পাশাপাশি ৬০০ ফুট দূরত্বে, মোহনপুর গ্রামের মৃত আফজাল হোসেনের ছেলে নজরুল ইসলাম ও গজিয়াবাড়ী গ্রামের রফিকুল ইসলামকে জমির ভুয়া কাগজমুলে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।
আর এভাবেই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ধুনট উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ২৯২টি অগভীর ও গভীর নলকূপের জন্য নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হয়। তন্মধ্যে প্রায় ২০০টি লাইসেন্সই ভূগর্ভস্থ বিধিমালা ও আইন না মেনে শুধুমাত্র ঘুষের বিনিময়ে প্রদান করা হয়েছে।
এবিষয়ে গোপালনগর ইউনিয়নের চরখুকশিয়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস জানান, আমার সংযোগকৃত অগভীর নলকূপের পাশেই আব্দুল আলিম নামে এক ব্যক্তিকে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। যা সেচ প্রকল্পের আইনের পরিপস্থী। ওই লাইসেন্সে নতুন সংযোগ প্রদান করলে আমার সেচ কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। এবিষয়ে উপজেলা সেচ কমিটি ও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার মিলছে না।
ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম মাহবুব জিয়া বলেন, আমরা তদন্ত করে সঠিক প্রতিবেদন দাখিল করেছিলাম। কিন্তু বিএডিসি অফিস ও সেচ কমিটি ‘অনুমোদন যোগ্য নয়’ এমন ব্যক্তিদেরও লাইসেন্স প্রদান করেছেন। একারনে সেচের সংযোগ দিতে আমাদেরকে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। তবে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কোন কর্মকর্তা এতে জড়িত নয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এবিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) শেরপুর ও ধুনট অঞ্চলের ইন্সপেক্টর ও ধুনট উপজেলা সেচ কমিটির সদস্য সচিব মাসউদুল করিম রানা ঘুষ আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমার অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ ও ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ পৃথকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তবে সমন্বয় না থাকায় কিছুটা অনিয়ন হতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন।
এবিষয়ে ধুনট উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি ও ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, আমি সেচ কমিটির সভাপতি হলেও বিএডিসি ও ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। সেই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলার ২৯২টি নতুন সেচের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ বিধিমালা ও আইন না মেনে নতুন লাইসেন্সের জন্য তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *