টাঙ্গাইলে ভোটের জায়গা নিয়েছে ‘সমঝোতা’

টাঙ্গাইলে ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনে এখন আর ভোটের প্রয়োজন হয় না। ভোটের জায়গায় এসেছে ‘সমঝোতা’। বিনা ভোটের কমিটির নেতাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের। একই অবস্থা জেলার শ্রমিক ফেডারেশন, ক্রীড়া সংস্থাসহ অরাজনৈতিক সাতটি সংগঠনে। সেখানেও ভোটের পরিবর্তে সমঝোতার নামে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা চাপিয়ে দেওয়া কমিটি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। প্রায় ১০ বছর ধরেই এ অবস্থা চলছে।

আওয়ামী লীগ ও ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকে বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সংগঠনে ভোট হলে পছন্দের নেতা নির্বাচন করা কঠিন। সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি হলে সংগঠনে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়। আবার এসব সংগঠনের নেতা হতে পারলে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করার পাশাপাশি চাঁদার ভাগ পাওয়াসহ নানাভাবে আয়ের পথ খুলে যায়। পাশাপাশি নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার বছরখানেকের মধ্যে জেলার রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য—সবকিছু সাবেক সাংসদ আমানুর রহমান খান (রানা) ও তাঁর ভাইদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাঁরা জেলার বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক সংগঠনের শীর্ষ পদ দখল করে নেন। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমদ হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমানুর ও তাঁর ভাইদের জড়িত থাকার বিষয়টি পুলিশি তদন্তে বের হয়ে আসে। এরপরই আমানুর ও তাঁর তিন ভাই আত্মগোপন করেন। পরে আমানুর গ্রেপ্তার হন। এরপর জেলার রাজনীতিতে তাঁদের কর্তৃত্ব খর্ব হলেও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা নির্বাচনে ‘খান পরিবার স্টাইলের’ কোনো বদল হয়নি। আমানুর এখন জামিনে আছেন। গত নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। তাঁর বাবা আতাউর রহমান খান আওয়ামী লীগের মনোনয়নে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সাংসদ হন।

এসেছে নতুন পরিবার

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, সাবেক সাংসদ আমানুর ও তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনির এবং তাঁর বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনি। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন সংগঠনের যেসব পদ খান পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন সেই সব পদ দখল করেছেন এই দুই ভাই ও তাঁদের অনুসারীরা।

বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলা শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন তানভীর হাসান। তিনি টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। একসময় এই পদে ছিলেন আমানুরের ছোট ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান। জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতিও এখন সাংসদ তানভীর।

এর আগে জেলার সব কটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সংগঠনের শীর্ষ পদ ছিল আমানুরের ভাই জাহিদুর রহমান খানের দখলে। তিনি একাধারে টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি, ভিক্টোরিয়া রোড ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি, জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির মহাসচিব ছিলেন। এখন জাহিদুরের জায়গা নিয়েছেন শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম কিবরিয়া। তিনি বর্তমানে টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক এবং বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির মহাসচিব।

ব্যবসায়িক সংগঠন, ক্রীড়া সংস্থা, শিল্পকলা, শ্রমিক সংগঠনে এখন আর ভোট হয় না
সব জায়গায় কমিটি হয় সমঝোতায়
সাবেক সাংসদ আমানুরের সময়ে সংগঠনগুলোতে ভোট বন্ধ হয়ে যায়
আমানুরের দেখানো পথেই চলছে সংগঠনগুলো
ভোটের পরিবর্তে সব জায়গায় কেন সমঝোতার কমিটি হচ্ছে, তা জানতে চাইলে সাংসদ তানভীর হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ভোট দিলেই বিশৃঙ্খলা হবে। এ জন্য আপসের মাধ্যমে সংগঠনগুলো চলছে। আমানুর ও তাঁর ভাইয়েরা প্রার্থী দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তাই ভোট দেওয়া হচ্ছে না। তবে সংগঠনগুলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলছে বলে তিনি দাবি করেন।

বর্তমানে ভিক্টোরিয়া রোড ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলেন তালেবর রহমান। তিনি শহর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হলেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ–বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

চেম্বার অব কমার্স

টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের বর্তমান কমিটির সভাপতি খান আহমেদ জেলা যুবলীগের সহসভাপতি। কমিটির সহসভাপতি সাইফুজ্জামান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

রাইফেলস ক্লাব

টাঙ্গাইল রাইফেলস ক্লাবেও নির্বাচন হয় না। আগে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমানুরের আরেক ভাই ছাত্রলীগ নেতা সানিয়াত খান। তাঁর অনুসারীদের বসানো হয়েছিল বিভিন্ন পদে। এখন তাঁদের যুগ শেষ। ২০১৮-১৯ সালের কমিটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহসভাপতি হয়েছেন বর্তমান সাংসদ তানভীর হাসান। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুর রকিব খান।

ক্রীড়া সংস্থা

টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি, পুলিশ সুপার সহসভাপতি ও একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সহসভাপতি মনোনীত হন। এই পদ তিনটি বাদে বাকি ২৩টি পদে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু সেগুলোতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সবাই।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় ক্রীড়া সংগঠককে যদি ক্রীড়াঙ্গনের পদে বসানো হতো, তাহলে আপত্তি ছিল না। এমন লোকদের ক্রীড়া সংস্থায় স্থান দেওয়া হয়েছে, যাঁরা কোনো দিন খেলা দেখতেও মাঠে যাননি।

শিল্পকলা ও অন্য সংগঠন

গত বছর টাঙ্গাইল জেলা শিল্পকলা একাডেমির পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। কমিটিতে পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি ও জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা সদস্যসচিব। কমিটির দুই সদস্য হলেন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল হক আলমগীর ও যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল হুদা। ১১ সদস্যবিশিষ্ট জেলা রেড ক্রিসেন্ট কমিটির নেতারাও আওয়ামী লীগের। টাঙ্গাইল জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতিতেও বিনা ভোটে সভাপতি হন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শিবলী সাদিক।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) টাঙ্গাইল শাখার সহসভাপতি বাদল মাহমুদ বলেন, সমাজের সব পর্যায়ে গণতন্ত্রচর্চা সংকুচিত হয়ে আসছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *