উৎস মুখ না খুলে করতোয়া-বাঙ্গালী নদী খনন সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ

 

জিয়াউদ্দিন লিটন, স্টাফ রিপোর্টার:  সম্প্রতি নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বেশ কয়েকটি খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তবে এ প্রকল্প কতটা বাস্তবায়ন হবে বা হলেও তা কতটা ফলপ্রসু হবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্টদের মাঝেই। তারা বলছেন নদীর উৎসের মুখ আটকে রেখে খনন করে ভালো ফল আশা করা যায়না। বাস্তবতা এমনটাই যে, করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী এখন প্রায় আধমরা । যে নদীতে এক সময় বড় বড় নৌকা, স্টিমার চলাচল করতো সেসব স্রোতস্বিনীতে এখন স্রোত নাই। স্থানীয়দের আক্ষেপ, পানি দূষণে নদীগুলোয় আর শেওলাও জন্মে না। বিশেষজ্ঞদের মতে করতোয়া, বাঙ্গালী, ইছামতি, নাগর নদীর পানির উৎস তিস্তা নদী। সেই তিস্তাতেই পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব নদীও স্রোতহীন হয়ে পড়েছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন,পানি প্রবাহ এবং পানি সংরক্ষণের জন্য কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। নদীর গতিপথ সচল করার এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে করতোয়া নদী খননের জন্য দুই হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা এবং বাঙ্গালী নদীর তীর সংরক্ষণ এবং খননের জন্য আরো দুই হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়াও মানাসের গতিপথ সচল করার জন্য সারিয়াকান্দির কামালপুরে যেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করে প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছিল। সেখানে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্লুইস গেইট নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্লুইস গেইটটি নির্মিত হলে এক দিকে মানাস নদী নাব্যতা যেমন ফিরে পাবে, অপরদিকে সেই স্রোতধারা ইছামতি এবং বাঙ্গালী নদী দুইটিকে সচল করবে ।
তবে বাস্তবের প্রেক্ষাপট বলে ভিন্ন কথা, মূলত করতোয়া নদীর গাইবান্ধার ১৯৮৮ সালের বন্যার পর খুলসিতে নির্মিত বন্ধ করা গেইট খুলে না দিলে নদী খনন কাজে কোনোই লাভ হবে না। গাইবান্ধা পয়েন্টে গেইট নির্মান করে ১২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ করতোয়া নদীকে মেরে ফেলে ওই অঞ্চলের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। এক সময় করতোয়ার পানির উৎস তিস্তা নদী হলেও ১৭৮৭ সালের বন্যায় তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে ভারতের পাহাড়ের জল যমুনাশ্বরী হয়ে এ নদীর উৎসমুখে পড়ে। গাইবান্ধা জেলায় করতোয়া নদীতে নির্মিত গেইট খুলে দেওয়ার আর্জি জানিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বেলার রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল। সেই উচ্চ আদালতে করা রিটের এখনও নিস্পত্তি হয়নি।
করতোয়া নদীতে লঞ্চ চলতে দেখার স্মৃতির কথা পড়ে শেরপুর শহরের আমিনুল ইসলাম বলেন, আগে করতোয়ায় গোসল করত, নদীর পানিও খেত,সেই খরস্রোতা করতোয়া এখন মরে গেছে। নদীতে স্রোত নেই,পানির বর্ণ নীল। নদীর পানি বিষাক্ত হওয়ায় এখন শেওলাও জন্মায় না। নদীর দুপাশ থেকে দখল হওয়ায় সরু নালায় পরিণত হয়েছে এক সময়ের বিশাল করতোয়া। বাঙ্গালী নদীও এক সময় প্রমত্তা ছিল জানিয়ে সুঘাটের রাশেদুল হক বলেন, নদী থেকে বিভিন্ন খাল দিয়ে বিলগুলোতে মাছ যেত। সারা বছর নদী, খাল, বিলে মাছ পাওয়া যেত। “নদী মরে যাওয়ায় খালও ভরাট হয়ে গেছে, অনেকে তা দখল করে চাষাবাদ করছে। বন্যার পানির সাথে পলি মাটি আসত। জমিতে কোনো রাসায়নিক সার দিতে হতো না। ফসলও হতো বেশি। এখন রাসায়নিক সার দিয়ে ফসল উৎপাদন করতে হয়। শেরপুর উপজেলার বৃহৎ বিল “ভস্তার বিল” পাড়ের জেলে নিতাই হালদার জানান, বিলে এখন আর বন্যায় মাছ আসে না। আগে এ বিলের মাছ ধরাই ছিল তাদের জীবিকার উৎস জানিয়ে তিনি বলেন তাই অনেকেই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছে।
স্থানীয়দের শঙ্কা নদীগুলো খনন করে পানি প্রবাহ না বাড়ালে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে। বাঙ্গালী-করতোয়াসহ এ এলাকার নদী উৎস মুখ খুলে সীমানা নির্ধারণ, দখল মুক্ত করে খনন করতে হবে, তবেই নাব্যতা ফিরে আসবে এবং পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে না বলে ভাবছেন সংশিষ্টরা। তারা বলছেন, শুধু নদী খননই নয়, নদীর সাথে যুক্ত খাল, বিলও দখল মুক্ত করে খনন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *