জিয়াউদ্দিন লিটন : লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট :
এই পৃথিবী যেমন ১৯১৪ ও ১৯৩৯ সালে ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী, ঠিক তেমনই তিনটি মহামারীর অসহায় দর্শক।এগুলোতে সর্বশ্রেণীর জীবন যেমন ধ্বংস হয়েছে তেমনি মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে আক্রান্ত বিশ্বের। এ বিশ্ব ১৭২০, ১৮২০, ১৯২০’র পর ২০২০ তার মানে ১০০ বছর অন্তর-অন্তরই সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করে মহামারী। এটি কি কাকতালীয় ঘটনা, না প্রকৃতির শুদ্ধিকরণ? ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ১৭২০ সাল থেকে ২০২০ এই চার শতাব্দিতে, প্রতি ১০০ বছর অন্তর অন্তর মানব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে মহামারী। কখনও সে এসেছে প্লেগ-রূপে, কখনও কলেরা, কখনওফ্লু , কখনও কোভিড-১৯। আজ আমরা কোভিড-১৯ এর চক্রে চক্রাকারে ঘুরছি। হয়তো আমরা এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছি অথবা কোন শিক্ষা নিতেই পারিনি। সে বিতর্কে যাচ্ছিনা। লিখতে বসেছি করোনাকালে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কথা।
১৯১১ সালে ভারতের অমৃতসরে গণহত্যার বিরোধিতার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাইট উপাধি ফিরিয়ে দেন, আবার ১৯৬৪ সালে “একজন লেখকের নিজেকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দেওয়া উচিত নয়” মনে করে ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী জাঁ-পল সাঁত্র সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করেছিলেন। আজ বর্তমান সময়ে দার্শনিক সাহিত্যিক ও সমাজকর্মীরা জাঁ-পল সাঁত্রের মত ভাবেন না। অন্যায় ও অবিচারের প্রতিবাদ করতেও চান না বরং প্রয়োজনে টাকা দিয়ে সেই সকল সম্মানসূচক পদবীগুলো কিনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তাই বুঝি আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছি।
২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল “উন্নত দেশগুলো মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা, মহামারী বা এরকম কোন জনস্বাস্থ্যের হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত নয়”। অপ্রিয় হলেও সত্য, বিশ্ব নেতৃত্ব এই প্রতিবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করার ফলেই জনস্বাস্থ্যের হুমকি মোকাবেলায় কোন ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারেননি। আর তাই আজ কোভিড-১৯ মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি। দুর্বিষহ এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অফিস-আদালত ও দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে পড়াশোনা ছাড়াও কিছু ব্যবসা বাণিজ্য ঘরে বসেই করা যাচ্ছে। তবে এ প্রসঙ্গে বিল গেটস সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন “দূরবর্তী শিক্ষার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার বৈষম্য কে আরো বাড়িয়ে তুলছে”। প্রচন্ড প্রতিকূলতা থাকা সত্বেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরাও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল। তাতে খুব ভালো সাড়া মেলেনি। একাজ করতে যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল-
১) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের মূল্য পরিশোধের বোঝা বহন করা।
২) নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহার করা।
৩) দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ
৪) বেশিরভাগ অভিভাবকদের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ডিভাইস কেনার অসামর্থ্যতা।
৫) বিদ্যুৎ বিভ্রাট
৬) পরিবেশের অভাব ইত্যাদি,ইত্যাদি।
আমাদের প্রিয় এই বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলে, মাধ্যমিক স্কুলে, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা মিলিয়ে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোন বা আইফোন কোনটাই নেই। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলেও এসব ছাত্রের অনলাইনে শিক্ষাদান সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয় গত বছর এই মহামারী স্থায়ী থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বই বিমুখ হয়ে চলেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারনে করোনার ঝুঁকি বাড়ছে না তো? কেবল কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ছাড়া কয়েক লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা কেউই কিন্তু সারাদিন বা প্রতিদিন ঘরে বসে থাকে না—ছেলেরা তো থাকেই না! কোন না কোন ভাবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তারা এখন বেশি বেশি বাহিরে যাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে , কাজিনদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেটে, শপিংমলে, পার্কে যাচ্ছে ! নিয়মিত ক্লাস, লেখাপড়ার কোন রুটিন বা চাপ না থাকাতে তারা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি বাহির মুখো হচ্ছে ! রাস্তায়, পার্কে , বিনোদন কেন্দ্রে অতীতের চেয়ে তরুনদের সমাগম বেপরোয়াভাবে বেডে গেছে যেটা আশংকাজনক হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় খুবই স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক ! কিশোর অপরাধ বেড়ে গেছে! তরুনদের কোন লেখাপড়া নাই, খেলাধুলার জায়গা নাই, দৈনন্দিন জীবন যাপনের কোন নির্দিষ্ট গাইড লাইন নাই—কাজেই যেটা হবার সেটাই হচ্ছে ! অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা! কার এতো সময় আছে এগুলি দেখার, ভাবার বা বোঝার ! কিন্তু করোনা কেন বাড়ছে? হঠাৎ গরম বাড়ার সাথে সাথে করোনার প্রকোপ কেন বাড়লো? আচ্ছা ভাবুন তো আপনার বা আমার ছেলে বা মেয়েটা প্রতিদিন বাহিরে যাচ্ছে, গনসমাবেশে এ শামিল হচ্ছে, করোনা ভাইরাস কি তাকে করুণা দেখাচ্ছ ? মোটেই না! তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশীর কারনে তারা করোনার পূর্বে যেমন ছিলো তেমন হিসাবে বাসায় ফিরছে এবং পরিবারের সবার সাথে স্বাভাবিক ভাবে বসবাস করছে! আচ্ছা তাতে ক্ষতি কি? তাতে আসলে ঐ সকল সুস্থ সবল তরুন-তরুনীদের মেধা সত্ত্ব ধ্বংস হলেও স্বাস্হ্যগত ক্ষতি খুব একটা হচ্ছে না! কিন্তু তাদের সংস্পর্শে আসা পরিবারের বয়স্ক বা রোগগ্রস্ত বা দুর্বল স্বাস্হ্যের যারা আছেন তারা কিন্তু খুব সহজেই আক্রান্ত হচ্ছেন ! খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাহলে সহজে বুঝবেন হাসপাতাল গুলোতে যেসব করোনা রুগী ভর্তি হচ্ছেন তারা অধিকাংশই এভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন! তাদের পরিবারের তরুন সদস্যারা কিন্তু নিয়মিত mask ব্যাবহারও করেন না! তাহলে করোনীয় কি? “বন্যেরা বনেই সুন্দর, শিশুরা মাতৃ ক্রোড়ে” সোজা শাপটা জবাব যার যেখানে স্থান তাকে সেখানে রাখুন ! ডাক্তার, নার্স কে হাসপাতালে, কর্মীদের বা করমচারীদেরকে কর্ম সথানে, ব্যবসায়ীদেরকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, শ্রমিকদের কারখানায় ,
সবাইকে যার যার সথানে পাঠালেন কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে রেড জোন ঘোষনা করে রাখলেন! শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিন, ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তাদের দৈনন্দিন রুটিন লাইফে ফিরিয়ে দিন, শিক্ষকদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনুন, তাদেরকে দায়িত্ব দিন তরুন প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা স্বাস্হ্যের দিকে খেয়াল রাখার এবং সচেতনতা গড়ে তোলার! তারা কাজে ব্যস্ত থাকবে, সুশৃংখল জীবনযাপন করবে, শিশু অপরাধ বা কর্তব্যে অবহেলা করার প্রবণতা কমবে—পরিবার গুলির ঝুঁকি কমবে, পারিবারিক তথা সামাজিক স্বস্তি ফিরে আসবে! অনুশাসনগুলি যুব সমাজকে অনুশাসন করুক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ব বিদ্যালয়ে সামাজিক দূরত্ব ও সু স্বাস্হ্য নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারী উদ্যোগে সহায়তার হাত বাডিয়ে দিন, শিক্ষকদেরকে তাদের কাজ ফিরিয়ে দিন তাতে তাদের মানসিক স্বাস্হ্য ও ভাল থাকবে! বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলির অনেকেই আর্থিক সংকটের কারনে শিক্ষক-কর্ম চারিদের সম্পূর্ন বেতন বোনাস দিতে পারছে না। আর্থিক সংকটের কারনে শিক্ষক পরিবারগুলো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়ে গেছে সেদিকটা সরকার বা অভিভাবক সংগঠনগুলির কেউ ভাবছেন না একথাও বলা যাবে না! একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা ! আমরা কি তেমন ঝুকির মধ্য পড়তে যাচ্ছি ? না কি আগে থেকেই পড়ে গেছি? শিক্ষার অবকাঠামোকে থমকে দিয়ে অন্যান্য পরিকাঠামো বানিয়ে লাভ কি ? তরুন প্রজন্ম তথা দেশের ভবিষ্যত কান্ডারিদের মেধায় যদি মরিচা ধরে যায় তাহলে এতসব পরিকাঠামো কাদের জন্য? অভিভাবকদের একটা অংশ হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলাকে ঝুঁকি মনে করছেন ! সেটা তাদের ভাবনায় থাকতেই পারে ! তবে তাদের পরিবারগুলোও কি এখন ঝুঁকি মুক্ত আছে? Let’s think more nationally and rationally than emotionally to sort a more practical way out to save the community of students, teachers and education staffs!
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

By Editor

Leave a Reply